দৌড়ানো পছন্দ নয়? সমপরিমাণ ক্যালোরি খরচ করতে বেছে নিন এই ৮টি বিকল্প ব্যায়াম
দৌড়ালে প্রচুর ক্যালোরি খরচ হয়, শরীরের সহনশক্তি বাড়ে এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে—এ কথা অনেকেরই জানা। ওজন নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত দৌড়ানোর একাধিক উপকারিতা রয়েছে। তবে সবার পক্ষে দৌড়ানো সম্ভব নয়। কারও হাঁটু বা গোড়ালিতে অস্বস্তি হয়, কেউ আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত ওজন কিংবা সময়ের অভাবে দৌড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন না। আবার অনেকের কাছে দৌড়ানো একঘেয়ে বা ক্লান্তিকরও মনে হতে পারে।
তবে দৌড়াতে না পারলেই যে ক্যালোরি খরচ কম হবে, এমনটা নয়। দৌড়ানোর পরিবর্তে বেশ কিছু বিকল্প শারীরিক কার্যকলাপ বেছে নেওয়া যায়, যেগুলি নিয়মিত করলে শক্তি খরচ, সহনশক্তি বৃদ্ধি এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তবে কোন ব্যায়ামে কত ক্যালোরি খরচ হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির ওজন, ব্যায়ামের তীব্রতা, সময়কাল, বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতার উপর।
দৌড়ানোর অন্যতম সহজ বিকল্প হল দ্রুত হাঁটা। এতে শরীর সচল থাকে, হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং নিয়মিত অভ্যাস করলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও উপকার পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, তাঁদের জন্য স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে গতি বাড়ানো একটি বাস্তবসম্মত উপায়।
দৌড়ানোর তুলনায় দ্রুত হাঁটায় সাধারণত প্রতি মিনিটে কম ক্যালোরি খরচ হয়। তাই একই পরিমাণ শক্তি খরচ করতে অনেক ক্ষেত্রে বেশি সময় হাঁটতে হতে পারে। তবে হাঁটার সময় গতি বাড়ানো, উঁচু-নিচু পথে হাঁটা বা নিরাপদ ট্রেডমিলে ইনক্লাইন ব্যবহার করলে শক্তি খরচ বাড়তে পারে।
দৌড়ানোর বিকল্প হিসেবে সাইকেল চালানো বেশ কার্যকর হতে পারে। এটি পায়ের পেশি সক্রিয় রাখে এবং হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের সহনশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। রাস্তার সাইকেল বা স্থির সাইকেল—দুইভাবেই এই ব্যায়াম করা সম্ভব। সাইকেল চালানোর সুবিধা হল, নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী গতি ও প্রতিরোধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কম গতিতে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় ও তীব্রতা বাড়ানো যেতে পারে। তবে সাইকেল চালানোর সময় নিরাপদ রাস্তা, উপযুক্ত হেলমেট এবং সঠিক সাইকেলের উচ্চতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যাঁরা দৌড়ানোর সময় হাঁটু, গোড়ালি বা কোমরে অতিরিক্ত চাপ অনুভব করেন, তাঁদের কাছে সাঁতার একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। জলে শরীরের ওজনের কারণে জয়েন্টের উপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। একই সঙ্গে সাঁতারে শরীরের একাধিক পেশি কাজ করে।
সাঁতারের গতি, স্ট্রোকের ধরন এবং বিরতির সময়ের উপর ক্যালোরি খরচ নির্ভর করে। দ্রুত সাঁতারে শক্তি খরচ বেশি হতে পারে, আবার ধীর গতিতে সাঁতার কাটা দীর্ঘ সময় ধরে শরীর সচল রাখার উপায়। তবে যাঁদের সাঁতার জানা নেই, তাঁদের প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ পরিবেশে শেখা উচিত।
ব্যায়াম করতে ভালো না লাগলেও নাচের মাধ্যমে শরীর সচল রাখা যায়। দ্রুত ছন্দের নাচ, জুম্বা বা অ্যারোবিক ডান্সে হাত-পা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় থাকে। ফলে এটি কার্ডিও ব্যায়ামের বিকল্প হতে পারে।
নাচের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা হল, গান ও ছন্দের কারণে অনেকের কাছে ব্যায়ামটি বেশি আনন্দদায়ক মনে হয়। নিয়মিত নাচলে সহনশক্তি ও সমন্বয় ক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে নাচের ধরন অনুযায়ী হাঁটু ও গোড়ালিতে চাপ পড়তে পারে। তাই নতুনদের কম তীব্রতার নাচ দিয়ে শুরু করা এবং ব্যথা হলে থেমে যাওয়া উচিত।
দড়ি লাফ একটি উচ্চ-তীব্রতার ব্যায়াম। অল্প সময়ের মধ্যেই শরীরের শক্তি খরচ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি পায়ের পেশি, ভারসাম্য এবং শরীরের সমন্বয় ক্ষমতা উন্নত করতেও সাহায্য করে।
তবে দড়ি লাফ সবার জন্য উপযুক্ত নয়। এতে বারবার মাটিতে অবতরণের কারণে হাঁটু, গোড়ালি ও পায়ের পাতায় চাপ পড়ে। অতিরিক্ত ওজন, জয়েন্টের সমস্যা বা ভারসাম্যের অসুবিধা থাকলে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ ছাড়া এই ব্যায়াম শুরু না করাই ভালো। যাঁরা উপযুক্ত, তাঁরা অল্প সময়ের কয়েকটি পর্ব দিয়ে শুরু করতে পারেন।
সিঁড়ি বেয়ে ওঠাও শক্তি খরচের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। এতে পায়ের পেশি কাজ করে এবং হৃদ্যন্ত্রের উপর কাজের চাপ বাড়ে। তবে দৌড়ানোর মতো একই পরিমাণ ক্যালোরি খরচ হবে কি না, তা ওঠার গতি, সময় এবং ব্যক্তির ওজনের উপর নির্ভর করে।
নতুনরা ধীরে ধীরে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ওঠা দিয়ে শুরু করতে পারেন। ওঠার সময় রেলিং ব্যবহার করা এবং নামার সময় সতর্ক থাকা জরুরি। হাঁটুতে ব্যথা, ভারসাম্যের সমস্যা বা হৃদ্যন্ত্রের অসুস্থতা থাকলে এই ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাড়িতে বা জিমে বিভিন্ন ধরনের অ্যারোবিক ব্যায়াম করা যায়। যেমন—মার্চিং, সাইড স্টেপ, নিয়ন্ত্রিত গতিতে হাত-পা চালানো কিংবা প্রশিক্ষকের নির্দেশে কম তীব্রতার কার্ডিও রুটিন। এগুলির মাধ্যমে শরীরের বড় পেশিগুলিকে সক্রিয় রাখা সম্ভব।
অ্যারোবিক ব্যায়ামের সুবিধা হল, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গতি এবং সময় ঠিক করা যায়। যাঁরা দৌড়াতে পারেন না, তাঁরা লাফানো ছাড়া কম-প্রভাবযুক্ত ব্যায়াম বেছে নিতে পারেন। তবে প্রতিটি ব্যায়ামের সঠিক পদ্ধতি শেখা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভুল ভঙ্গির কারণে পেশি বা জয়েন্টে আঘাত না লাগে।
জিমে রোয়িং মেশিন ব্যবহার করেও কার্ডিও ব্যায়াম করা যায়। এই যন্ত্রে পা দিয়ে চাপ দেওয়া, শরীরের অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা এবং হাত দিয়ে টানার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন পেশি একসঙ্গে কাজ করে। সঠিক কৌশলে রোয়িং করলে হৃদ্যন্ত্রের সহনশক্তি ও পেশির কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে যাঁদের কোমর বা পিঠে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সঠিক ভঙ্গি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষকের সাহায্যে কৌশল শিখে কম প্রতিরোধে শুরু করা ভালো।
দৌড়ানোর পরিবর্তে অন্য ব্যায়াম বেছে নিলে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—একই সময় ধরে সব ব্যায়ামে সমান ক্যালোরি খরচ হয় না। উদাহরণস্বরূপ, দ্রুত হাঁটার তুলনায় জোরে সাইকেল চালানো বা দ্রুত সাঁতারে প্রতি মিনিটে শক্তি খরচ বেশি হতে পারে। আবার ধীর গতির ব্যায়াম বেশি সময় ধরে করলে মোট শক্তি খরচ বাড়ানো সম্ভব।
সাধারণভাবে, কোনও ব্যায়ামে আনুমানিক ক্যালোরি খরচ নির্ধারণের জন্য ব্যক্তির ওজন, ব্যায়ামের তীব্রতা এবং সময়কাল বিবেচনা করা হয়। তাই সবার জন্য একই সময়ের নির্দিষ্ট ব্যায়ামকে দৌড়ানোর সমতুল্য বলা ঠিক নয়। স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ট্র্যাকার আনুমানিক হিসাব দিতে পারে, কিন্তু সেই হিসাবও পুরোপুরি নির্ভুল নয়।